বুধবার, অক্টোবর ২৮

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে শক্তিশালী বাণিজ্য অংশীদারত্বে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

0

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সুসম্পর্ককে এবার শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার জোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই লক্ষ্যে দেশের অটোমোটিভ (যানবাহন) উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ-এই মূল পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় আকারের বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর) টোকিওর জেট্রো হলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম ডায়ালগ’-এ প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমি জাপানি কোম্পানিগুলোকে পারস্পরিক সুবিধার স্বার্থে এ পাঁচটি মূল খাতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা ও ব্যবসার সুযোগ অন্বেষণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের অপ্রকাশিত সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কাজ করছে, তবে দেশটিতে জাপানের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ এখনও ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, গত অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রফতানি ছিল ১.৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং জাপান থেকে আমদানি হয়েছিল ২.১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাই এই সম্পর্ককে কেবল উন্নয়ন সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর অন্যতম ছিল জাপান। বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে। তিনি পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করেন, যাঁরা একাধিকবার জাপান সফর করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সুদৃঢ় করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান এ বছর একটি ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য কোনো দেশের সাথে স্বাক্ষরিত প্রথম এ ধরনের চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭,৩৭৯টি পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে স্টিল, অটোমোটিভ পার্টস ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে। তিনি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের বাজার, গড় বয়স ২৭ বছরের তরুণ ও কর্মক্ষম জনশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বড় সুবিধা হিসেবে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটিতে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অটোমোটিভ খাতকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে তারেক রহমান বাংলাদেশে একটি গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে অটোমোবাইল জায়ান্ট টয়োটা-র পরিকল্পনাকে স্বাগত জানান। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন। জ্বালানি খাতে তিনি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমন্ত্রণ জানান। তিনি উল্লেখ করেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং বিস্তৃত জ্বালানি খাতের জন্য বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাপানের ‘জেরা’র সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিক্স এবং ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিংকে গুরুত্ব দিয়ে একটি ‘বাংলাদেশ-জাপান টেকনোলজি পার্ক’ এবং উদ্ভাবন-কেন্দ্রিক আইটি পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মহাকাশ প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। জাপান স্পেস সায়েন্স, স্যাটেলাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার মহাকাশ সক্ষমতা জোরদার করতে চায়। রেল ও লজিস্টিকস খাতকে অপর অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করে দেশব্যাপী একটি আধুনিক ও দ্রুতগতির উন্নত রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। এ জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরি, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে হরেক রকমের শস্য, ফল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। জাপানি কোম্পানিগুলো আড়াইহাজারে গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন’-এ বিনিয়োগ করতে পারে, যা সুমিতোমো কর্পোরেশন জাপানি মানে উন্নয়ন করছে। জাপানি কোম্পানিগুলোর উত্থাপিত কিছু উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দক্ষ অবকাঠামো, সহজ কাস্টমস ও কর ব্যবস্থার বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের চাহিদার কথা সরকার গুরুত্বের সাথে শুনেছে এবং এসব সমাধানে কাজ করছে। তিনি আশ্বাস দেন, ব্যবসায়ীদের নিশ্চিন্ততা এবং বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন—আমরা সেটি পুরোপুরি বুঝি। আমাদের কাজ হলো এই দুটির উপযোগী সঠিক পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া। জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে যান। সরকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যাতে লাখ লাখ তরুণ কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি জাপানি ভাষায় পারদর্শী হতে পারে। এই দক্ষ পেশাদাররা জাপান ও বাংলাদেশ উভয় দেশের কর্মসংস্থানের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখতে পারবে। বাংলাদেশ যখন তার ভিত্তি নির্মাণ করছিল, তখন জাপান পাশে দাঁড়িয়েছিল। এখন আমরা আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি আমাদের শিল্প গড়ে তুলতে, নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে এবং একসঙ্গে সমৃদ্ধি অর্জন করতে,-বলেন প্রধানমন্ত্রী। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (জেবিসিসিইসি) এবং জাপানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের যৌথ সহযোগিতায় এই ফোরামের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে জেট্রো সভাপতি সুসুমু কাতাওকা সূচনা বক্তব্য দেন এবং জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি ভাইস-মিনিস্টার শিনজি ওয়াকায়ামা অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন। অন্যান্যদের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গঠন নিয়ে এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বিনিয়োগ সহজীকরণে সরকারের নানা সংস্কার তুলে ধরেন। এছাড়া মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানির ঢাকা শাখার জেনারেল ম্যানেজার কেনইচিরো কাওয়ামোতো এবং ওয়াইকেকে কর্পোরেশনের গ্লোবাল সেলসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদও বক্তব্য রাখেন।

Share.