ঢাকা অফিস: বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ১০০ দিন পার হয়েছে। এমপি, মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং তাঁর অধীনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্ত্রণালয় সড়ক ও সেতু, নৌ এবং রেল। নতুন মন্ত্রীর কার্যক্রমে যেমন কিছু সাফল্য দৃশ্যমান তেমন দীর্ঘদিনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোও স্পষ্ট। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক মাসের মাথায় পবিত্র ঈদুল ফিতর এবং তারপর ঈদুল আজহা-দুই উৎসবে ঘরমুখো মানুষের জন্য নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা ছিল সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কোটি মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত করা, টোল প্লাজায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ফেরিঘাটে বিশেষ ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে বৃহত্তম এই উৎসব দুটিতে মহাসড়ক সচল থাকায় দুর্ভোগের মাত্রা ছিল সহনীয়। সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব নিয়ে কথা বলেছেন তিন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় চালানো কতটা চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন-প্রশ্নে তিনি বলেন, কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। কাজ করতে পারলে সবকিছু দায়িত্বের সঙ্গে করা যায়। মন্ত্রণালয়গুলোকে কার্যকর করতে যে দায়িত্ব রয়েছে সেগুলো যদি আপনি জানেন, বোঝেন তাহলে কোনো সমস্যা নেই। বর্তমান সরকারের যে নীতি রয়েছে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে সমন্বিতভাবে ফাংশন করার বিষয়টি একটা জায়গা থেকে সুপারভিশন ও নীতিনির্ধারণ হওয়া দরকার। প্রকল্প গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা দরকার। আমার ওপর যে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শুরু থেকেই সেসব মন্ত্রণালয়ের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অগ্রাধিকারের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা দরকার, সেটা স্বচ্ছতার সঙ্গে অপচয় রোধ করে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে করার চেষ্টা করছি। বেশ কিছু প্রকল্প আছে যেগুলো স্থবির হয়েছিল সেগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে কীভাবে আবার সচল করা যায় সেটা প্রাধান্য পাচ্ছে। সরকারের ১৮০ দিনের একটি কর্মসূচি রয়েছে, পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহারেও কিছু অঙ্গীকার রয়েছে সেগুলো সামনে রেখে অগ্রসর হচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে কেমন লাগছে জানতে চাইলে শেখ রবিউল আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর গতিটা একটু বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় মন্ত্রণালয়গুলো ফাংশন ওভাবে করতে অভ্যস্ত না। কারণ এই গতিতে কাজ করতে আমাদের মন্ত্রণালয়ের যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আছেন সেটা আপনি টেকনিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশন বলেন অথবা সিভিল সেকশন বলেন-তারা এভাবে অভ্যস্ত কম ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। সেই গতিতে তাদের ফাংশন করানোটা একটু চ্যালেঞ্জ। কারণ আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে চাই। পাশাপাশি স্বচ্ছতার সঙ্গে, কম ব্যয়ে, অপচয় রোধ করে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে চাই। সেখানে যখন আমি যাচ্ছি তখন বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা দেখা যাচ্ছে। ধরেন- আন্তমন্ত্রণালয়ে বেশ কিছু কর্মকাণ্ড বা বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকে যেগুলো ম্যানেজ করা অথবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। কোনো কোনো সময় সেই জায়গায় দীর্ঘসূত্রিতা দীর্ঘদিনের একটা প্রাকটিস। আমাদের এই মন্ত্রণালয়গুলোতে তাদেরকে গতিশীল করাটা একটা চ্যালেঞ্জ এবং সে লক্ষ্যে কাজ করছি। অনেকগুলো প্রকল্প ছিল যেগুলো ছোটখাটো সিদ্ধান্তের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন হচ্ছিল না অথবা যারা পিডি ছিলেন অথবা প্রকল্পের দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের বেশ কিছুটা অদক্ষতা অথবা পরিস্থিতি বুঝে সফল হতে না জানা এরকমের কিছু ব্যত্যয় ছিল। সেগুলোকে এই তিন মাসের মধ্যে আলোচনা করে তাদেরকে দিয়ে সেই পরিস্থিতি উত্তরণ করাতে সক্ষম হয়েছি। যার ফলে আমি মনে করছি যে, ভালো চলছে এবং যে আস্থা জনগণ রেখেছে এবং যে দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী আমাকে দিয়েছেন সেটা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে শতভাগ দিয়ে চেষ্টা করছি। এসবের সুফল পাওয়া শুরু হয়েছে এবং এটা আরও বেগবান হবে। আরও বেশি দৃশ্যমান হবে। আপনি নিজেও গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন-এমন প্রশ্নে শেখ রবিউল আলম বলেন, প্রথমত-প্রধানমন্ত্রী যে গতিতে এগোতে চাইছেন সেই গতিটা ধারণ করতে পারছি। সে গতিতে আমিও চলতে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং অনেকটা অভ্যস্ত। কারণ যে আদর্শ ধারণ করে উনি রাজনীতি করেন আর যে প্রতিকূলতার মধ্যে উনি রাজনীতি করেছেন আর যে জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেছেন ওটারও একটা অংশ আমি। কিন্তু আমি যখন মাঠ লেভেলে বা মন্ত্রণালয় লেভেলে কাজ করছি সেখানে তাদেরকে গতিতে আনতে তো আমার একটু সময় লাগছে। মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের কর্মকর্তা যারা আছেন তারাও গতিশীল হতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। হয়তো একটু সময় লাগছে। সহকর্মী মন্ত্রী ও এমপিদের কাছ থেকে সড়ক নির্মাণ বা মেরামত নিয়ে কেমন অনুরোধ পাচ্ছেন, জানতে চাইলে শেখ রবিউল আলম বলেন, প্রচণ্ড রকমের আবেদন তাদের। ১৭ বছর ইনফ্রাস্ট্রাকচারে খুব বেশি ডেভেলপমেন্ট হয় নাই। প্রকল্পগুলো কাগজ-কলমে হয়েছে। সেই প্রকল্পগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনবান্ধব হয়নি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হয়নি। যার ফলে যারা এবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন জনগণের কাছে তাদের অঙ্গীকার আছে। এ কারণে প্রচুর পরিমাণে ডিও দিচ্ছেন। কিন্তু সেই পরিমাণ ডিওকে আমলে নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করাটা বেশ দুরূহ। কারণ আর্থিক সক্ষমতা অথবা বাজেটের তো একটা ব্যাপার আছে। তার মধ্যে থেকে সেটা শতভাগ বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। এক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে যেটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এমপির ওই এলাকার জনগণের জন্য অগ্রাধিরকার ভিত্তিতে প্রয়োজন- সেটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। স্থানীয় জনগণের অর্থাৎ স্থানীয়ভাবে যিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তারও তো ১০টা অঙ্গীকার আছে। ১০টা রাস্তার প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমার বাজেটের মধ্যে যদি মনে হয় যে না ১০টা এবারে করা সম্ভব হচ্ছে না, একবারে সব সম্ভব হবেও না, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তিনটা চারটাকে বেছে নিয়ে আমরা কাজ করছি সুশাসন, টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতি অনিয়ম এবং নিম্নমানের কাজের অভিযোগ কীভাবে ক্ষতিয়ে দেখছেন, জানতে চাইলে শেখ রবিউল আলম বলেন, এরই মধ্যে এসব খতিয়ে দেখা হয়েছে। সেগুলোর তদন্তও চলছে। আমার সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার-এখন থেকে এসব আর হবে না- এটা আমি নিশ্চিত করব ইনশাল্লাহ। যে প্রক্রিয়ায় আগে প্রকল্প হতো-অপচয়, দুর্নীতি, অপ্রয়োজনীয়, জনবান্ধব না- সেই ধরনের প্রকল্প এখন এ সরকার নেবে না। এটা প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার। আর প্রধানমন্ত্রী যেটা অঙ্গীকার করেন, যে লক্ষ্যে দেশ পরিচালনা করতে চান তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে আমার কর্তব্য। আমার জন্য সেটা অবধারিত। এখন থেকে যে সব প্রকল্প হবে তাতে দুর্নীতি ও অপচয় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনি যেহেতু তিনটা মন্ত্রণালয় এই মুহূর্তে দায়িত্বে আছেন। সেক্ষেত্রে তিনটা মন্ত্রণালয়ে আপনার উল্লেখ করার মতো বিশেষ প্রোগ্রাম কী নিয়েছেন বা বিশেষ ধরনের কী প্রকল্প নেওয়া হয়েছে? শেখ রবিউল আলম বলেন, রেল, নৌ এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় একটা আমূল পরিবর্তন আনতে চাচ্ছি। এজন্য নানা মেয়াদি কার্যক্রম এরই মধ্যে হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগামীতে আমার এখানে উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ার সুযোগ হবে না বলে আশা করছি। আমরা চাইব-অতীতের দায় যাদের আছে সেটা তাদের। আমাদের ক্ষেত্রে যাতে এটা না হয়।
আমূল পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি
0
Share.