তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের হইচই করার প্রয়োজন নেই

0

ঢাকা অফিস: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে কেন্দ্র করে কিছু ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াকে অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস। এক সম্পাদকীয় কলামে পত্রিকাটি লিখেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের হইচই করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক উন্নয়ন কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয় এবং এ সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের অবস্থানের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ারও কথা নয়। ওই সম্পাদকীয় কলামে উল্লেখ করা হয়, বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চীন সফর করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম চীন সফর। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য ‘নতুন চ্যাম্পিয়নদের’ ১৭তম বার্ষিক সভায়ও অংশ নেবেন। এই সফর ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি- বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক উন্নয়নে যে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, তারই প্রতিফলন। বাংলাদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন ও বাংলাদেশ একাধিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করবে, যা দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থার গভীর ভিত্তি এবং সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বাহ্যিক আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব থেকে উদ্ভূত একাধিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প বৈচিত্র্যকরণকে উৎসাহিত করা এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ঘাটতি পূরণ করা— এই সবই বাংলাদেশের জন্য জরুরি অগ্রাধিকার। চীন টানা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশটিতে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং সম্মিলিতভাবে কয়েক লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে চীন বাংলাদেশের জন্য শতভাগ ট্যারিফ লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করেছে, যা বাংলাদেশের কৃষি রপ্তানিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ফলস্বরূপ, তারেক রহমানের সফরের মূল লক্ষ্য হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামোগত সহযোগিতা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কৌশলগত সংলাপ। এই সফর চীন এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে গভীরতর সহযোগিতার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। চলতি মাসেই মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি মিন অং হ্লাইং রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন বেইজিং, সাংহাই এবং হাংঝৌতে। সফরে উভয় দেশ একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎসহ চীন-মিয়ানমার কমিউনিটি গঠনে গতি আনার বিষয়ে একটি যৌথ বিবৃতি জারি করে। গত মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ চীন সফর করেন এবং উভয় দেশের নেতারা নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যৎসহ আরও ঘনিষ্ঠ চীন-পাকিস্তান কমিউনিটি গড়ে তোলার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ় অগ্রগতি বাস্তবায়নে সম্মত হন। এছাড়াও, তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইমোমালি রাহমন এবং ব্রুনাইয়ের যুবরাজ হাজি আল-মুহতাদী বিল্লাহ চীন সফর করেন। সেখানে তারা জ্বালানি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো খাতে পারস্পরিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। গত এপ্রিলে ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতি ও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক তো লাম চীন সফর করেন। সেখানে উভয় পক্ষ আন্তঃসীমান্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা অঞ্চল, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং ডিজিটাল শিল্প খাত নিয়ে একাধিক সমঝোতায় পৌঁছায়। এদিকে, দালিয়ানে আসন্ন গ্রীষ্মকালীন দাভোস ফোরামে প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতারাও চীনে সমবেত হবেন। উচ্চপর্যায়ের এই সফরের ধারা চীনের উন্নয়ন থেকে উদ্ভূত সুযোগগুলো কাজে লাগানোর জন্য অনেক দেশের প্রবল ইচ্ছাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর এই বৃহত্তর ধারারই একটি অংশ। গ্লোবাল টাইমসের কলামে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক উন্নয়ন কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। এছাড়া কোনো তৃতীয় পক্ষ দ্বারা তা প্রভাবিতও হওয়া উচিত নয়। এটি বরাবরই চীনের ধারাবাহিক অবস্থান ও নীতিগত অবস্থান। তবে, আমরা লক্ষ্য করেছি যে কিছু ভারতীয় গণমাধ্যম এই বিষয়টি নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশি নেতার প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, প্রতিবেশী ভারতকে উপেক্ষা করে চীনকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। আবার কেউ বাংলাদেশ-চীন পানি ব্যবস্থাপনা সহযোগিতাকে নয়াদিল্লির জন্য সংবেদনশীল বলে মন্তব্য করেছেন। গ্লোবাল টাইমসের মতে, এসব প্রতিক্রিয়ার পেছনে কিছু মানুষের ‘বড় ভাই’ মানসিকতা কাজ করছে। তারা প্রতিবেশী দেশের নেতাদের প্রথম বিদেশ সফরকে আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের প্রতীক হিসেবে দেখেন এবং স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে নিজেদের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। প্রকৃতপক্ষে, চীন বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। একই সাথে ভারতের সাথেও বাস্তব সহযোগিতা গড়ে তুলতে ইচ্ছুক। চীন ও ভারতের উচিত ভালো প্রতিবেশী, বন্ধু এবং এমন অংশীদার হওয়া, যারা একে অপরকে সফল হতে সাহায্য করবে এবং যা প্রায়শই ‘ড্রাগন-এলিফ্যান্ট ট্যাঙ্গো’ নামে পরিচিত, তা অর্জন করবে। একই সাথে, ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত ও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায় চীন। এই সম্পর্কগুলো পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া এমন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তুলতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম, যা সকল পক্ষের জন্য সুবিধা বয়ে আনবে। চীন উন্মুক্ত আঞ্চলিকতাবাদে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চীন-ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর, কিংবা চীন-বাংলাদেশ ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব— এই কাঠামোসমূহ কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। বরং এই অঞ্চলে পারস্পরিকভাবে লাভজনক বহুপাক্ষিক সহযোগিতার জন্য সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত। উদাহরণস্বরূপ তিস্তা নদী প্রকল্পের সহযোগিতার কথা বলা যায়। ভারত ও বাংলাদেশ নদীটির উজান ও ভাটির দেশ, এবং চীন ও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পানিসম্পদ বিষয়ে সহযোগিতা বজায় রেখেছে। চীন আন্তঃসীমান্ত নদী জলবিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ এবং বন্যা প্রতিবেদন তৈরির মতো বিষয়েও দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সাথে সহযোগিতা করে আসছে। এটি এই ক্ষেত্রে ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতার ব্যাপক সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। বর্তমানে উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা একটি সুস্পষ্ট প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অভিন্ন অগ্রাধিকার হলো জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, আধুনিকায়নের অগ্রগতি এবং আঞ্চলিক সংযোগ শক্তিশালী করা। চীন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচনীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশটি সকল দক্ষিণ এশীয় দেশের সাথে পারস্পরিকভাবে লাভজনক সহযোগিতা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। চীন তার পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৬-৩০) অবিচলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে, এর উন্নয়নের সুফল প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ক্রমশ প্রসারিত করতে চায়। চীনের ধারাবাহিক উদ্যোগ ও সাফল্য প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে আরও বিস্তৃত হবে বলে বেইজিং বিশ্বাস করে। দক্ষিণ এশিয়ায় যৌথ সমৃদ্ধি ও পারস্পরিক লাভজনক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে।

Share.