বিনোদন ডেস্ক: ভেনিস থেকে টরন্টো, টরেন্টো থেকে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ এবার পাড়ি জমাচ্ছে ৭০তম বিএফআই লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। উৎসরেব মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে লড়াই করবে লেখক, পরিচালক ও প্রযোজক রুবাইয়াত হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে ৭০তম আসর অনুষ্ঠিত হবে ৭ থেকে ১৮ অক্টোবর। উৎসবের এবারের আসরে ‘বেস্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য নির্বাচিত হয়েছে ১০টি সিনেমা। সেই ১০টির একটি বাংলাদেশের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায় এর আগে কোনো বাংলাদেশি সিনেমা জায়গা করে নিতে পারেনি। সেই শূন্যতা ভেঙে এবার ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাল রুবাইয়াত হোসেনের সিনেমাটি। এর আগে বিশ্বের প্রাচীনতম চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর অন্যতম ভেনিসে নির্বাচিত হয়েছিল ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। এরপর জায়গা করে নেয় কানাডার মর্যাদাপূর্ণ টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও। লন্ডনের সেরা ছবির পুরস্কারের দৌড়ে রুবাইয়াত হোসেনের চলচ্চিত্রটির সঙ্গে রয়েছে জাপানের হিরোকাজু কোরে-এদার ‘লুক ব্যাক’, ইউক্রেনের সের্গেই লোজনিতসার ‘ইম্পেরিয়াম’, যুক্তরাজ্যের ক্যারল মরলির ‘৭ মাইলস আউট’, হাঙ্গেরির লিলি হরভাটের ‘মাই নোটস অন মার্স’, আর্জেন্টিনার বেঞ্জামিন নাইশতাটের ‘গ্ল্যাক্সো’, আইরিশ নির্মাতা জুটি ক্রিস্টিন মলয় ও জো ললারের ‘অ্যাক্ট ৩’, ইতালির জিওভান্নি তরতোরিচির ‘কেটিসে’, পোল্যান্ডের মালগোর্জাতা সুমোভস্কা ও মাইকেল এঙ্গলার্টের ‘দ্য ইডিয়টস’ এবং ডেনমার্কের মে এল-তুখির ‘উইমেন আননোন’। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ একটি মনস্তাত্ত্বিক হরর চলচ্চিত্র। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘মেফেয়ার’ বিউটি পার্লারকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রটির গল্পে জাইনীন নামের এক তরুণী বিয়ের প্রস্তুতির জন্য পার্লারে আসে। প্রস্তুতি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্য, শরীর, বিশ্বাস, স্মৃতি ও ভয়কে ঘিরে এক অস্বস্তিকর ও রহস্যময় জগতে সে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। চলচ্চিত্রটির প্রধান চিত্রগ্রহণ শুরু হয় ২০২৫ সালের ৮ জুন এবং শেষ হয় ৮ জুলাই। মোট ২৬ দিনে শুটিং সম্পন্ন হয়। পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ হয়েছে ফ্রান্সের প্যারিস এবং পর্তুগালের লিসবনে। চলচ্চিত্রটির চূড়ান্ত শব্দ মিশ্রণের কাজ সম্পন্ন হয় প্যারিসে। ফ্রান্সের ল্য ফিল্মস দেলাপে-মিদি ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর মূল প্রযোজক। সহ-প্রযোজনা করেছে পর্তুগালের মিদাশ ফিল্মেশ, বাংলাদেশের খনা টকিজ, নরওয়ের বারেন্টসফিল্ম এএস এবং জার্মানির ট্যান্ডেম প্রোডাকশন। চলচ্চিত্রটির আন্তর্জাতিক বিক্রয়ের দায়িত্বে রয়েছে ফিল্মস বুটিক। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন চৌধুরী করিম। সহ-অভিনয়ে রয়েছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু ও সুনেরাহ কামাল। অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম ও মোহাম্মদ বারী। চলচ্চিত্রটি সহায়তা পেয়েছে কাউন্সিল অব ইউরোপের ইউরিমাজ; ফ্রান্সের সিএনসি বা সঁত্র নাসিওনাল দু সিনেমা এ দ্য লিমাজ আনিমে-এর এদ ও সিনেমা দু মন্দ; পর্তুগালের ইনস্টিটুতো দু সিনেমা এ দু অডিওভিজুয়াল; ইতালির ফোন্দাৎসিওনে প্রাদা ফিল্ম ফান্ড; নরওয়ের সোরফন্ড এবং জার্মানির ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ড থেকে। ফোন্দাৎসিওনে প্রাদা ফিল্ম ফান্ডের প্রথম আসরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জমা পড়া ১ হাজার ২০০টির বেশি প্রকল্পের মধ্য থেকে মাত্র ১৪টি চলচ্চিত্র সহায়তার জন্য নির্বাচিত হয়। নির্বাচিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে স্বর্ণপামজয়ী থাই নির্মাতা আপিচাতপং বীরাসেথাকুলের নতুন চলচ্চিত্রও রয়েছে। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্বাচিত ১৪টি চলচ্চিত্রের মধ্যে পোস্ট-প্রোডাকশন পর্যায়ে সহায়তা পাওয়া একমাত্র চলচ্চিত্র। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ইএভিই প্রডিউসার্স ওয়ার্কশপ, বার্লিনালে কো-প্রোডাকশন মার্কেট এবং লেজ আর্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস বিভাগে অংশ নিয়েছে। চলচ্চিত্রটির প্রযোজক ফ্রান্সের ফ্রঁসোয়া দার্তেমার, পর্তুগালের পেদ্রু বোরজেস, বাংলাদেশের রুবাইয়াত হোসেন ও আদনান ইমতিয়াজ আহমেদ, নরওয়ের ইংরিড লিল হটগুন এবং জার্মানির আনা কাচকো। এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত চারজন নারী বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত। রুবাইয়াত হোসেন শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, রিকিতা নন্দিনী শিমু এবং সুনেরাহ কামালও শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। চলচ্চিত্রটির নির্মাণে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। কম্পোজার ছাড়া চলচ্চিত্রটির সব বিভাগের প্রধানই নারী। চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রহণ করেছেন পর্তুগালের লিওনর তেলেস, যিনি ২০১৬ সালে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য গোল্ডেন বেয়ারজয়ী সর্বকনিষ্ঠ নির্মাতা হন। গ্যাফার হিসেবে কাজ করেছেন ফ্রেদেরিকা আর. গোমেস এবং বাংলাদেশ থেকে খোরশেদ আলম ও মো. সাদ্দাম। ক্যামেরা বিভাগে ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যামেরা হিসেবে ছিলেন মাফালদা ফ্রেসকো এবং সেকেন্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যামেরা হিসেবে ছিলেন মারিয়ানা সান্তানা। চলচ্চিত্রটি সম্পাদনা করেছেন রাফায়েল মার্তা-হোলগার এবং তাকে সহায়তা করেছেন লরিস আলোনসো-দ্যুমা। কালার গ্রেডিং করেছেন আন্দ্রেয়া বের্তিনি। ভিএফএক্সের কাজ সম্পন্ন করেছে প্যারিসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ম্যাথমেটিক। ভিএফএক্স শুটিং সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন আর্নো শেলে। চলচ্চিত্রটির প্রোডাকশন ও পোস্ট-প্রোডাকশন তত্ত্বাবধান করেছেন কেভিন শাতি। প্রোডাকশন ডিজাইন ও কস্টিউম স্টাইলিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন জোনাকি ভট্টাচার্য। আর্ট ডিরেক্টর ছিলেন সাদাব জাফর, অ্যাসিস্ট্যান্ট আর্ট ডিরেক্টর ছিলেন জুবায়ের আল ফাহিম এবং প্রপমাস্টার হিসেবে কাজ করেছেন আকিফ আহমেদ হাবিব। প্রধান চরিত্র জাইনীনের কয়েকটি পোশাকের নকশা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ বছর বয়সী অনোরা কফি। ওয়ার্ডরোব বিভাগে কাজ করেছেন পূজাঞ্জলি চৌধুরী, জেবিন তানহা, আনাম, রুবি ও ওসমান। মেইক আপ ও প্রস্থেটিকের দায়িত্ব পালন করেছেন ওলগা জোসে এবং তাকে সহায়তা করেছেন ফরহাদ রেজা মিলন। শব্দগ্রহণ করেছেন মারি-ক্লোতিন্দ শেরি। বুম অপারেটর হিসেবে কাজ করেছেন রবিউল আলম এবং অতিরিক্ত শব্দগ্রহণ করেছেন সজীব রঞ্জন বিশ্বাস। শব্দ পরিকল্পনা করেছেন জোয়ানা নিজা ব্রাগা, সিএএস। ফোলি শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন তেরেসা ব্রাগা এবং ফোলি মিক্সার ছিলেন দেবোরা অলিভেইরা। এডিআরের কাজ করেছেন রাজেশ সাহা ও সাকির আহমেদ অন্তু। অতিরিক্ত ফোলির কাজও করেছেন সাকির আহমেদ অন্তু। চূড়ান্ত শব্দ মিশ্রণ করেছেন নাতালি ভিদাল। চলচ্চিত্রটির কম্পোজার ব্রিটিশ জিম উইলিয়ামস, যার কাজের মধ্যে রয়েছে জুলিয়া দুকুরনোর আলোচিত চলচ্চিত্র ‘র’ এবং তার স্বর্ণপামজয়ী ‘তিতান’। সংগীত পরিচালনা করেছেন দামীর খান এবং সিলেকটাউনের স্তেফান জাঙ্ক মিউজিক্যাল সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন।
এই প্রথমবার লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবের মূলপর্বে বাংলাদেশের সিনেমা
0
Share.