মঙ্গলবার, অগাস্ট ১৮

এখনো পলাতক ৬৯০ বন্দি, ১৬৬ জনের তথ্যই হারিয়েছে কারা দপ্তর

0

ঢাকা অফিস: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪৭ বন্দির মধ্যে এখনো ৬৯০ জনকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাদের মধ্যে ১৬৬ জনের পরিচয়সংক্রান্ত কোনো তথ্য কারা অধিদপ্তরের কাছে নেই। এসব বন্দি নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন। কারাগারটির নথিপত্র ও সার্ভার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের তথ্য সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া তালিকাভুক্ত ৯ জঙ্গির মধ্যে ৬ জনকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনো তিনজন পলাতক রয়েছেন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পুরান ঢাকার বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন। কারা মহাপরিদর্শক জানালেন, ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে প্রায় ২ হাজার ২৪৭ বন্দি পালিয়ে যান। বর্তমানে তাদের মধ্যে প্রায় ৬৯০ জন পলাতক রয়েছেন। এর মধ্যে ১৬৬ জন নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন। ওই কারাগারের নথিপত্র ও সার্ভার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য আদালতের কাছে আবেদন করা হয়েছে। নরসিংদী কারাগার থেকে মোট ৮২৬ বন্দি পালিয়েছিলেন। পলাতক জঙ্গিদের বিষয়ে তিনি জানালেন, কারাগার থেকে তালিকাভুক্ত মোট ৯ জঙ্গি পালিয়ে যান। তাদের মধ্যে ছয়জনকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের একজন জুয়েল ওস্তাদ জামিনে কারাগারের বাইরে ছিলেন। সম্প্রতি পুলিশ তাকে আবার গ্রেপ্তার করেছে। এখনো তিন জঙ্গি পলাতক আছেন। সম্প্রতি রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের সঙ্গে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক বললেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের কোনো ধরনের সংযোগ আছে কি না, তা নিয়ে তারাও কিছুটা চিন্তিত। এ বিষয়ে তারা কাজ করছেন। কিছুদিন আগে গ্রেপ্তার হওয়া জুয়েল ওস্তাদের সঙ্গে পলাতক বোমারু মামুনের কারাগারে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাদের মতো জঙ্গিদের কারাগারে একসঙ্গে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক বলেছেন, বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় আলাদাভাবে রাখার ক্ষেত্রে আবাসন-সংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেছেন, বর্তমানে কাউকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখা সবসময় সম্ভব হয় না। একই ওয়ার্ড বা ভবনে থাকার কারণে বন্দিরা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়ে যান। এক্ষেত্রে কারা ব্যবস্থাপনায় কিছু দুর্বলতা ছিল। তবে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুতর বন্দিদের পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখে আলাদা জোনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি কারাগারেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কারাগারে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের কারারক্ষীদের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, কারাগারে কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার হচ্ছে না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। গত এক বছরে বিভিন্ন অভিযানে ৩ হাজারের বেশি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। কোনো তথ্য পাওয়া গেলে বা বিষয়টি শনাক্ত হলে তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও কথা বলেন কারা মহাপরিদর্শক। ‘কারাগারে চিকিৎসক-সংকট রয়েছে। চিকিৎসকের জন্য মোট ১৫১টি পদ থাকলেও বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। অন্যান্য কারাগারে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে অস্থায়ীভাবে চিকিৎসক দেওয়া হচ্ছে। তারা অন্য জায়গায় দায়িত্ব পালন করায় কারাগারে পূর্ণকালীন সময় দিতে পারছেন না। বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারে ১০১ জন সিভিল সার্জন চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।’ ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় সব কারাগারেই ফার্মাসিস্ট অথবা মেডিকেল ও ডিপ্লোমা যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী রয়েছেন। সম্প্রতি সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) থেকে ৫৫ জন নার্স নিয়োগের আদেশ হয়েছে। শিগগিরই তারা যোগ দেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন কারা মহাপরিদর্শক। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার বাড়ায় কারাগারে বন্দি ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে বলেও জানালেন কারা মহাপরিদর্শক। তিনি বলেছেন, সাধারণত প্রায় ৮০ হাজার বন্দি নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ কাজ করে। বর্তমানে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার ৭৯৬ জন বন্দি কারাগারে প্রবেশ করছেন এবং প্রায় ৩ হাজার জন মুক্তি পাচ্ছেন। ফলে বন্দিদের নিয়মিত আসা-যাওয়া থাকলেও যে সংখ্যা থেকে যাচ্ছে, সেটিই মোট বন্দির সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি আরও জানালেন, ১ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ২৬ হাজারের বেশি মোবাইল কোর্টে দণ্ডিত আসামিকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ এটি। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অনেককে এক দিন, পাঁচ দিন, সাত দিন, এক মাস বা তিন মাসের মতো স্বল্পমেয়াদি সাজা দেওয়া হচ্ছে। এতে কারাগারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোয় ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন জানিয়ে কারা মহাপরিদর্শক বলেছেন, তাদের মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হয়েছে। তারা নিজ নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও সরকারের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ধাপে ধাপে তাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিদেশি বন্দি মারা গেলে তাদের মরদেহ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন জানালেন, গত দুই বছরে প্রায় ১৭ জন বিদেশি বন্দির মরদেহের ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মরদেহ ভারতে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে তিনটি মরদেহ বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণত তিন মাস পর মরদেহের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট পরিবার বা দেশ থেকে কেউ মরদেহ নিতে না এলে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে সংবাদ সম্মেলনে কারা মহাপরিদর্শক কারাগারে দুর্নীতি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন। তিনি বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কারা অধিদপ্তর জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। গত দুই বছরে ২১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৮২ জনকে চাকরিচ্যুত এবং ৮৭০ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ছোটখাটো অপরাধের কারণে ৩০৩ জনকে প্রশাসনিকভাবে বিভিন্ন বিভাগের বাইরে পাঠানো হয়েছে। মাদকসংক্রান্ত অপরাধে কারারক্ষীসহ কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে বলেও জানালেন তিনি। কারা মহাপরিদর্শক আরও জানালেন, দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার বন্দির হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ৯৮ হাজার বন্দি রয়েছেন।

Share.