ঢাকা অফিস: দুর্নীতি দমন কমিশনে সদ্য বিদায়ি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এ তদন্ত এড়াতেই তিনি ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশ ত্যাগ করেছেন। বিদেশে যাওয়ার সময় তাঁর সরকারি জিও বা অনুমতি ছাড়পত্র ছিল না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, সদ্য বিদায়ি প্রধান উপদেষ্টা তাঁকে বিদেশে চলে যেতে সহায়তা করেছেন। এজন্যই বিমানবন্দরে তাঁকে প্রথমে আটকানো হলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তৈয়্যবের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ রয়েছে, তার প্রায় সবই ড. ইউনূসের ইচ্ছায় করেছেন। তৈয়্যব তাঁর মেয়াদে গ্রামীণফোনকে নিয়মনীতির বাইরে সুযোগ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গ্রামীণফোনের ৩৯ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা ইউনূস নিয়ন্ত্রিত গ্রামীণ টেলিকমের। অর্থাৎ এসব সুবিধায় ড. ইউনূস সরাসরি লাভবান হয়েছেন। নানান বিষয়ে যখন তিনি দুদকের নজরে তখনই তাঁর গোপনে চলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিস্মিত হয়েছে বলে জানা গেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, ড. ইউনূস জানতেন যে তৈয়্যব দুদকের নজরদারিতে আছেন, এ কারণেই তাঁকে পরে যেন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে না হয়, সেজন্যই বিদায়ি প্রধান উপদেষ্টা বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। কারণ তৈয়্যবকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ড. ইউনূসের নামও আসত বলে অনেকেই মনে করেন। ড. ইউনূস তাঁর শাসনামলে বিদেশি কয়েকজন নাগরিকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যাঁদের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আনু মুহাম্মদ তাঁদের ‘বিদেশি এজেন্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। আনু মুহাম্মদ দাবি করেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন) মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার কেন ও কীসের বিনিময়ে জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো করছে, তার একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং এর মধ্যে যারা দায়ী, তাদের বিচারের সম্মুখীন করা। সেটা করার জন্য এই সরকারের মধ্যে যারা এসব তৎপরতা চালাচ্ছে, তারা যেন দেশ থেকে বের হতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘নিয়মনীতিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হচ্ছে। উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর মুখোশ পরিয়ে এই সরকারে ইউনূস সাহেব (প্রধান উপদেষ্টা) প্রকৃতপক্ষে বিদেশি কোম্পানি এবং বিদেশি রাষ্ট্রের লবিস্টদের নিয়োগ করেছেন।’ কিন্তু আনু মুহাম্মদের দাবি আমলে না নিয়ে এ রকম অন্তত দুজন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের আগেই দেশ ত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে। এঁদের একজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। যা দুদক তদন্ত করছে। ড. ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে ’২৪-এর নভেম্বরে আইসিটি পলিসি অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী নিযুক্ত হন তিনি। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব নেদারল্যান্ডসের নাগরিক। কোন যোগ্যতায় কীসের ভিত্তিতে তাঁকে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তার ব?্যাখ্যা প্রধান উপদেষ্টা কখনোই দেননি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তৈয়্যব অনৈতিকভাবে গ্রামীণফোনকে অবারিত সুযোগ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গ্রামীণ টেলিকম ড. ইউনূসের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই টেলিকম ও আইসিটি খাতে ফয়েজ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তাঁর বিরুদ্ধে মোট দুর্নীতির পরিমাণ প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিনটি বড় খাত থেকে অর্থ সরানোর অভিযোগ ছিল গুরুতর। নগদ কেলেঙ্কারি : মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সেখানে নিজস্ব লোক বসানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত সহকারী আতিক মোর্শেদকে ব্যবহার করে এ খাত থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, এ অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি : বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, ফয়েজ তৈয়্যবের হস্তক্ষেপে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই এ ব্যয় বাড়িয়ে ৩২৬ কোটি টাকা করা হয়। বাড়তি ১৬০ কোটি টাকা লোপাটের পরিকল্পনা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। লাইসেন্স বাণিজ্য : টেলিকম খাতে বিভিন্ন লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ দুদক তদন্ত শুরু করলে তিনি চিঠি দিয়ে তা থামিয়ে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও তৈয়্যব এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিযোগে বলা হয়, ‘চাহিদা মাত্র ২৬ টেরাবাইট ব্যান্ডউইথের, অথচ কেনা হচ্ছে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার যন্ত্রপাতি, তা-ও প্রায় ৩২৬ কোটি টাকায়। যেখানে প্রকৃত প্রয়োজন মেটাতে সর্বোচ্চ ১৬৫ কোটি টাকা যথেষ্ট। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সুপারিশ, এমনকি দুদকের স্পষ্ট আপত্তিও উপেক্ষা করে অপ্রয়োজনীয় এ যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এ প্রক্রিয়া সচল রাখতে দুদকের কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন তৈয়্যব। যিনি নিজ প্যাডে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন।’ এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তৈয়্যব। লিখিত বক্তব্যে তিনি টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স কেন্দ্র করে ‘স্বার্থান্বেষী মাফিয়াদের রোষানলে পড়েছেন’ বলে অভিযোগ করেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী তাঁর অবস্থান তুলে ধরে দুদককে চিঠি দেওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করেন। ‘বিটিসিএলের ফাইভজি রেডিনেস’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নিয়ে অভিযোগের পর অনুসন্ধানে নামে দুদক। ওই অভিযোগে বলা হয়, দরপত্রের শর্তানুযায়ী দরদাতাদের মূল্যায়ন না করে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে শুধু প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্যের ভিত্তিতে তিনজন দরদাতাকেই কারিগরিভাবে ‘রেসপনসিভ’ ঘোষণা করাসহ ‘নন রেসপনসিভ’ দরদাতাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ৫ গুণ বেশি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি কিনে বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি করা হচ্ছে। এ অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ‘পিপিএ ও পিপিআর লঙ্ঘনের প্রমাণ মেলা’র তথ্য দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে গত ১৮ জুন চিঠি দেয়। এতে প্রকল্পের ‘অর্থছাড় বন্ধ রাখার’ পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া চালিয়ে নিতেই তৈয়্যব ২২ জুন দুদক চেয়ারম্যানকে চিঠি লেখেন। এসব বিতর্ক মাথায় নিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের আগেই তড়িঘড়ি করে দেশ ছাড়েন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। ১৪ ফেব্রুয়ারি এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে (ইকে-৫৮৩) জার্মানির উদ্দেশে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। সমাজমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে নানান আলোচনা- সমালোচনার প্রেক্ষাপটে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তৈয়্যব। তিনি দাবি করেন, এক টাকাও দুর্নীতি করেননি। কিন্তু প্রশ্ন হলো-কোনো দুর্নীতি না করলে এভাবে গোপনে কেন দেশ ত্যাগ করলেন? প্রধান উপদেষ্টাই বা তাঁকে বিদেশে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলেন কেন?
দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কীভাবে দেশ ছাড়লেন ইউনূসের বিশেষ সহকারী?
0
Share.