প্রতি বছর বিশ্বে ২০ হাজার ভূমিকম্প হলেও কেন বাংলাদেশে ঝুঁকি ভিন্ন?

0

ঢাকা অফিস: বিশ্বে বছরে ২০ হাজার ভূমিকম্প, তবে বাংলাদেশের ঝুঁকি আলাদা—কারণ কী?ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূ-প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী গড়ে ৫০–৬০টি এবং বছরে ২০ হাজারেরও বেশি ভূমিকম্প হয়ে থাকে। তবে সব ভূমিকম্প যে দুর্যোগ বা মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করে তা নয়।ভূমিকম্প কতটা ভয়াবহ হবে তা নির্ভর করে কম্পনের শক্তি, ভূকম্পনের উৎসের গভীরতা, ঝাঁকুনির স্থায়িত্ব, ভূমিকম্প সংঘটিত অঞ্চলের অবস্থান এবং জনবসতির ঘনত্বসহ বেশ কয়েকটি উপাদানের ওপর। এসব প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠে—বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ হলেও এটি অবস্থান করছে পৃথিবীর বৃহত্তম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের কাছাকাছি। ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের সংযোগস্থলের খুব নিকটে হওয়ায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এটি সরাসরি উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশের তালিকায় পড়ে না। তবে চারপাশের সক্রিয় ফল্টলাইনযুক্ত অঞ্চল—বিশেষত ভারত ও মিয়ানমারের ভূকম্পন—নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে অনুভূত হয়। ফলে কম মাত্রার কম্পনও জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে।বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, বাংলাদেশের ঝুঁকি মূলত ভূমিকম্পের ঘনত্ব নয় বরং উৎসের জটিলতা। তিনি জানান, দেশে মোট পাঁচটি পরিচিত সিসমিক সোর্স রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে আরও দুটি ব্লাইন্ড সোর্স—যেগুলোর উৎস নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। এই অজানা উৎসগুলোর কারণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে, বিশেষত সেইসব এলাকায় যেখানে ভবন নির্মাণে অনিয়ম রয়েছে এবং জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। অন্যদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, জাপান, ফিলিপাইন ও নিউজিল্যান্ড। প্যাসিফিক রিং অব ফায়ারের ওপর অবস্থান করার ফলে এসব দেশে প্লেট সংঘর্ষ ও আগ্নেয়গিরি সক্রিয়তার মাত্রা বেশি। ফলে চার মাত্রার বেশি ভূমিকম্প এসব দেশে বছরে কয়েকশ’ থেকে কয়েক হাজার বার পর্যন্ত ঘটে। তবুও মৃত্যুহার সেখানে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কারণ এসব দেশে ভবন নির্মাণে কঠোর নিয়ম-কানুন, শক্তিশালী সিসমিক ডিজাইন কোড, উন্নত প্রযুক্তি, নিয়মিত দুর্যোগ প্রস্তুতি মহড়া এবং শক্তিশালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা রয়েছে। পাশাপাশি জনসংখ্যার ঘনত্বও অনেক কম, ফলে ধসের ঝুঁকিও কম থাকে।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন, বিশেষত রাজধানী ঢাকায়। সম্প্রতি জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫’ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জনসংখ্যার দিক থেকে ঢাকার বর্তমান অবস্থান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে। ঢাকার জনসংখ্যা এখন ৩ কোটি ৬৬ লাখ, যা টোকিওকেও পেছনে ফেলেছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে ২০৫০ সালে ঢাকা হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর।এত বিপুল জনবসতি, নরম মাটির গঠন, সিসমিক কোড না মানা এবং ভবন নির্মাণে অনিয়ম—এই চারটি কারণে ঢাকার ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে। পুরান ঢাকা, চট্টগ্রামের পাহাড়সংলগ্ন এলাকা এবং সিলেট অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ মাত্রার ভূমিকম্পেও আতঙ্ক ও ক্ষয়ক্ষতির অভিজ্ঞতা রয়েছে।এক জরিপ অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে বাংলাদেশে অনুভূত হয়েছে অন্তত ৬০০টি ভূকম্পন। এর মধ্যে ৪.০ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প বছরে গড়ে ৫–৮টি। বেশিরভাগই মৃদু বা মাইক্রো কম্পন। তুলনায় জাপানে বছরে লক্ষাধিক মাইক্রো কম্পন হয়, আর ৪ মাত্রার বেশি কম্পন হয় ১,০০০–১,৫০০টি। নিউজিল্যান্ডেও বছরে রেকর্ড ২০ হাজারের বেশি কম্পন নথিভুক্ত হয়, যার মধ্যে বেশিরভাগই মাইক্রো ভূমিকম্প।সুতরাং কম্পনের সংখ্যার হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ নয়, কিন্তু সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিচারে এটি মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ ভূমিকম্পের শক্তি নয়, বরং দুর্বল ও মানহীন ভবন কতটা ধসে পড়ে মানুষ নিহত হবে—সেইটাই মূল উদ্বেগ।ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ভূমিকম্প স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা, যা ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি কমানো সম্ভব যদি ভবন নির্মাণে কঠোরতা, সিসমিক ডিজাইন কোডের বাস্তবায়ন, সুসংগঠিত নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা যায়। তার মতে, “ভূমিকম্প মানুষকে সরাসরি হত্যা করে না; মানুষ মারা যায় ভবন ধসে কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে।”বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প যদি জনবহুল এলাকায় আঘাত হানে, তখন তা মুহূর্তে মহাদুর্যোগে রূপ নেয়। আর যদি মহাসাগরের নিচে ঘটে, তবে উপকূলীয় এলাকায় সুনামির সতর্কতা জারি হতে পারে।

Share.