ঢাকা অফিস: আগামীকাল অনষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের গণমাধ্যমের মতো বিশ্ব গণমাধ্যমেও বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং রাজনৈতিক নেতারা বলেছেন এই ভোট বিশ্বের অন্যতম নজরকাড়া বিষয় হবে — কারণ এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে ভোট কতটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হবে তা প্রধান আলোচ্য বিষয়। দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান প্রধান ভোটার উদ্বেগের বিষয় বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। রয়টার্স-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে নির্বাচনের প্রধান ইস্যুগুলোর মধ্যে অন্যতম দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। ইতোমধ্যে ভোটারদের চাওয়া-পাওয়ার হিসেবের চুলচেরা বিশ্লেষনের মাধ্যমে সরব হয়ে ওঠেছে ভোটের প্রচারণা। আল জাজিরায় তরুণ বা জেন-জি ভোটারদের ভূমিকাকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়েছে। তারা এ ভোট আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিঃস্বার্থ ও সুষ্ঠু হবে কি না — তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের কাছে বড় প্রশ্ন বলে প্রশ্ন রেখেছে। প্রায় সকল বিশ্বমিডিয়াতে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে এই নির্বাচনে যুব ভোটারদের প্রভাব খুব প্রবল —ভোটরদের প্রায় অর্ধেকই তরুণ। তরুণরা বেশি সংস্কার, চাকরি এবং সামাজিক পরিবর্তন চাইছে, যা নির্বাচনকে ‘জেন-জি-প্রভাবিত’ বা ‘তরুণ-চালিত’ ভোট হিসেবে দেখাচ্ছে। এপি, আর জাজিরা, বিবিসিসহ সব গণমাধ্যমে এই নির্বাচনের গণতান্ত্রিক গুরুত্ব, তরুণ ভোটারদের শক্তি, অর্থনৈতিক-সামাজিক ইস্যু এবং ভোট সুষ্ঠু হবে কি না-এ সবচেয়ে বেশি আলোকপাত করেছে। তরুণ ভোটাররা ভোটের ফল এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় বড় প্রভাব রাখতে পারে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তাদের সংবাদগুলোতে রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের পরিবর্তন নিয়ে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার কথাও গুরুত্ব পেয়েছে। আল জাজিরায় জামায়াতে ইসলামীর শফিকুর রহমানকে নিয়ে বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। যেখানে ৫০ বছর পর আবার রাজনৈতিক দৃশ্যে জামায়াতের নির্বাচনে পুরোদমে অংশ নেয়ার বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যক্তি সফিকুর রহমানের রাজনীতি ও সামাজিক গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে তারা সামনে নিয়ে এসেছে। রয়টার্স বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে ‘বাংলাদেশের তারেক রহমান: নির্বাসন থেকে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে’-প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যাতে আসন্ন নির্বাচনে তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। তাদের প্রতিবেদনে তারেক রহমানকে হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মতে তারেক রহমান তার বাবা-মা যেভাবে একসময় দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এ নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনিও প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। ডন এক প্রবেদনে ‘বাংলাদেশে নির্বাচন প্রস্তুতিতে ইসলামপন্থীদের অবস্থান জোরদার’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতাপশালী আওয়ামী লীগের (বিএএল) পতনের পর ছাত্র-নেতৃত্বাধীন এনসিপি একটি শক্তিশালী ইসলামপন্থী জোট একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে উল্লেখ করে। তাদের প্রতিবিদনে তারা এক স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকের স্বাক্ষাতকারে দেয়া -পরবর্তী সংসদ ‘ধনীদের ক্লাব’ হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে থাকবে, যেখানে ‘শ্রমিক, কৃষক, নারী বা সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত থাকবে’ বলে উল্লেখ কর হয়েছে। এবং ইসলামী দলগুলো সবচেয়ে অধিক নির্বাচনী প্রচারণারনায় অংশগ্রহণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশার ‘পুনর্নির্মাণ’ হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহের পর নাটকীয় পরিবর্তনটি ঘটে, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ, লৌহ-মুষ্টিবদ্ধ শাসনের অবসান ঘটায়। অস্থিরতার সময় শত শত মানুষের মৃত্যুর জন্য আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা এখন বিচারের মুখোমুখি। আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে, ‘বিএনপির তারেক রহমান কি তিনিই, যাকে খুঁজছে হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ?’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বিএনপি নেতারা তাদের নির্বাচনি জনসভায় ব্যাপক ভোটার উপস্থিতিকে প্রমাণ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন যে তাদের দল (বিএনপি) দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নিপীড়িত ছিল। বিএনপি ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরে আসার লক্ষ্যে সমর্থকদের একত্রিত করতে এবং তাদের শক্তি পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। এপি তাদের প্রতিবেদনে সামাজিক ঐক্য, সংখ্যালঘু অধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। `বাংলাদেশীরা সেই নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন যা জাতির ভবিষ্যৎকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে সংখ্যালঘুর অধিকারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দয়া হয়। শেখ সালিক ও সোনাল গাঙুলির লেখা ওই প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া, ক্ষমতা থেকে উৎখাতের বিষয়টি উল্লেখ করে ‘১৮ মাস আগে যুব-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করে এবং নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সূচনা করে’ -প্রকাশ করলেও তাদের প্রকাশ ভঙ্গী সবার চেয়ে আলাদা এবং একপেশে বলে বাস্তবতার নিরিখে মনে হচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্ট ‘তাদের ভাষায়: বাংলাদেশিরা এমন একটি নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন যা জাতির ভবিষ্যৎকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভোটাররা বৃহস্পতিবার ভোট দিতে যাচ্ছেন যা দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাদের প্রতিবেদনটিতে এপির প্রতিবেদনের পুনরোল্লেখ করা হয়েছে। আরটিতে এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন এবং গণভোট দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণ এবং বাণিজ্যের গতিপথকে প্রভাবিত করবে। এই নির্বাচনে একটি পরিবর্তনশীল জাতির গতিপথ, ভবিষ্যতের শাসনব্যবস্থা এবং দক্ষিণ এশীয়ায় আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে জরুরি ভুমিকা রাখবে। হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ শাসন করেছে, যখন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং তার সরকারের অনেক মন্ত্রীকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। এখন, দলটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা ভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, ২০২৪ সালে জেনারেল জেড বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্বে সহিংস বিদ্রোহের পর প্রথম ভোটগ্রহণ, যা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে ‘বিপ্লবের উত্তরাধিকারী বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের প্রচারণার মাঠে’ শিরোনামে তারা ২০২৪ এর গণঅভ্যত্থানকে বিপ্লব হিসিবে চিহ্নিত করে ২০২৬ এর নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগওলোকে বিপ্লবের উত্তরাধিকার হিসিবে উল্লেখ করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলি ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের কথা তুলে ধরেছে যা শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। প্রতিবেদনটিতে বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে ‘১৭ কোটি’ জনসংখ্যার দেশের জন্য পরিবর্তনের প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার জন্য দলগুলো যখন রাজধানী ঢাকা জুড়ে ধারাবাহিক প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচনি সমাবেশে অংশ নিয়েছিল, তখন হাজার হাজার পতাকাবাহী সমর্থক উপস্থিত ছিলেন- এ বিবরণে তারা উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে নির্বাচনের প্রচারণা। আনাদোলু অনেকগুলা প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাংদেশের নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বসহ প্রচার করে। তারা ‘২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচনে ভোট দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশীরা’-শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘নির্বাচনী প্রচারণা শেষ, বৃহস্পতিবার ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য ১২ কোটিরও বেশি যোগ্য ভোটার ভোট দেবেন’ বলে উল্লেখ করেন। বর্ণনা, প্রকাশভঙ্গী আলাদা হলেও প্রায় সকল আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে পরবর্তী সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার (জজেন-জি) গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পলায়ন, আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা, তরুণদের স্বপ্ন- দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন, বেকারত্ব মুকি্ত এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রত্যাশার বিষয়টি সকল গণমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরব বিশ্ব গণমাধ্যম
0
Share.