ঢাকা অফিস: জাতীয় সংসদে বুধবার (২২ এপ্রিল) ‘দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ’ বিষয়ক নোটিশ উত্থাপন করে সরকারকে কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান। এই নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। তারা বিরোধী দলীয় সংসদ নেতার প্রস্তাবে সম্মতি জানান। দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাকে ‘সংকট’ বলতে রাজি নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। প্রস্তাবের জন্য বিরোধী দলীয় নেতাকে ধন্যবাদও জানান তারা। এসময় সংসদে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনে বিরোধী দলীয় নেতা যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে সরকারি দল সম্মত। এর আগে, বিরোধী দলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান তার আনীত নোটিশে বলেন, ‘দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ কমাতে সরকার অবিলম্বে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। বর্তমানে সারা দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মানুষ জ্বালানি পাচ্ছে না। যার ফলে জনজীবনে বহুমাত্রিক সংকট দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো—সারা দেশে যখন জ্বালানির জন্য হাহাকার চলছে তখন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সংকটের কথা অস্বীকার করে বিভ্রান্তিকর দাবি জানাচ্ছেন। সরকারের এই বাস্তবতা বিবর্জিত ও অস্বীকারের প্রবণতা সংকটকে আরো বাড়াচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ করে তুলছে। তাই বর্তমান সংকটের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা এবং সংকট নিরসনে সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত সমাধান অতি জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বিষয়টা (জ্বালানি) আসলেই বাংলাদেশের একক বিষয় নয়। বিষয়টা আগেও বলেছি। বিষয়টা বৈশ্বিক। বাংলাদেশের কারণে এটা (জ্বালানি সংকট) তৈরি হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ এটার ভুক্তভোগী। এটা শুধু পরিবহনের ক্ষেত্রে নয়, দেশের সর্বক্ষেত্রে যেখানেই জ্বালানির সম্পৃক্ততা রয়েছে… কল-কারখানা, কৃষি থেকে শুরু করে সর্বত্রই এই সমস্যা বিরাজমান। তাই বিষয়টা আলোচনার সর্বোচ্চ দাবি রাখে। আমি আমার নোটিশ উত্থাপন করছি।’ এই আলোচনায় অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে বিরোধী দলীয় নেতা একটি নোটিশ উপস্থাপন করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত শুরু হয় এবং পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালী কার্যত অকার্যকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়, আমাদের দেশের আমদানিকৃত জ্বালানির বেশিরভাগ সৌদি আরব ও আমিরাত কেন্ত্রিক। ফলে জ্বালানি তেলের প্রাপ্যতা ও সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় সরকার পরিস্থিতির গভীরতা অনুধাবন করে শুরু থেকে একটি সংযত ও সুরক্ষামূলক জ্বালানি সরবরাহ নীতি গ্রহণ করে।’ তিনি বলেন, আমরা প্রতি মুহূর্তে বুদ্ধি নিচ্ছি, পরামর্শ নিচ্ছি। আপনারা দেখেছেন, পরীক্ষামূলকভাবে ফুয়েল পাস আমরা চালু করেছি ঢাকায়। আমরা যেটি সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, প্রতিটা জেলা শহরে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার চিত্র অনেক উন্নত হয়েছে। বক্তব্যের শেষ দিকে প্রতিমন্ত্রী পরামর্শ নেওয়ার জন্য বিরোধীদলীয় নেতাকে এবং তার টিমকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কক্ষে আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা যদি আমন্ত্রণ জানান, সেক্ষেত্রে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাকে ‘সংকট’ বলতে রাজি নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি দাবি করেছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে বোরো চাষাবাদ ব্যাহত হয়নি এবং কোনো কলকারখানা বা ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ হয়নি। বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এটাকে সংকট বলতে চাই না। বিরোধী দলীয় নেতা দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকটের কথা বলেছেন, কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করতে চাই—জ্বালানির কারণে কি বোরো চাষ ব্যাহত হয়েছে? ১৪ এপ্রিলের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সহনীয় মাত্রায় জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। যদি সংকটই হতো, তবে কি কোনো মিল-ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়েছে? চাষাবাদ, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-বাণিজ্য তো সবকিছুই স্বাভাবিক চলছে। তাহলে সংকট কোথায়?’ জ্বালানি তেলের কালোবাজারি ও মজুত প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘কোথাও কালোবাজারি বা মজুত হলে সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলোই (র্যাব, পুলিশ, বিজিবি) খুঁজে বের করছে। অনলাইনে তেল বিক্রির কালোবাজারি চক্রকেও ধরা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিন-রাত মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে এবং প্রতিটি ডিপো ও পাম্পে রুটিন মাফিক তদারকি করা হচ্ছে।’ সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, বর্ডার এলাকায় দাম কম থাকলে কিছু পাচারের প্রবণতা থাকে। তবে সরকার সফলভাবে জ্বালানি তেল বা সিলিন্ডার পাচার রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কৃতিত্ব অনেকে স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু আমরা সফলভাবে পাচার ঠেকিয়ে দিয়েছি।’ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ, ‘জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে টুকু বলেন, ‘জ্বালানি সংকট নেই, এটা কৃত্রিম সংকট। পাম্পে জ্বালানি তেলের জন্য যে লাইন তা স্বাভাবিক না, এটা ষড়যন্ত্র হতে পারে।’ জ্বালানি তেলের অবৈধ লাইনের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ার আহ্বান জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বিরোধী দলীয় নেতার প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি, ‘সংকট’ বলতে নারাজ তিন মন্ত্রী
0
Share.